২১ ভাদ্র, ১৪১৭
৫ সেপ্টেম্বর, রবিবার, ২০১০

প্রথম পাতা দেশের আরো খবর দেশের আরো খবর সিলেটের যোগাযোগ ব্যবস্থার বেহাল দশা
সিলেটের যোগাযোগ ব্যবস্থার বেহাল দশা

অপূর্ব শর্মা, ২৯ জুলাই (শীর্ষ নিউজ ডটকম): সিলেটে যোগাযোগ ব্যবস্থার বর্তমান হাল একেবারেই নাজুকএখানে শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ায় উদ্যোক্তাদের অনীহার অন্যতম কারণ যোগাযোগ ব্যবস্থার এ দৈন্যদশাঅথচ বলা হচ্ছে, ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তোলা হবেসেক্ষেত্রে সিলেটের এমন ভাঙাচোরা আর খানাখন্দে ভরা রাস্তাঘাট দিয়ে নিশ্চয়ই তা সম্ভব নয় সিলেট বাংলাদেশের অন্যতম একটি বিভাগএ বিভাগের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন এভাবে মুখ থুবড়ে পড়ে 

থাকলে দেশ ডিজিটাল করা যাবে নাসেক্ষেত্রে সিলেটের যোগাযোগ ব্যবস্থার বর্তমান স্থবিরতা কাটিয়ে এর প্রাধিকারভিত্তিক উন্নয়নে এখনই তৎপর হতে হবেরাষ্ট্রের সামগ্রিক উন্নয়নেরও প্রধান শর্ত উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থাশিল্প আর ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসারের মূলেও রয়েছে উন্নত সড়ক যোগাযোগসিলেটের আন্তঃবিভাগীয় যোগাযোগ ব্যবস্থার চিত্র রীতিমত ভয়ানকঅনেক উপজেলার সাথে সরাসরি সড়ক যোগাযোগই নেইমহাসড়কগুলোর অবস্থাও মহা-যন্ত্রণাদায়ককয়েকটি মহাসড়ক তো বন্দি হয়ে আছে প্রতিশ্রুতির বৃত্তেআগেরবার আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে সিলেট-সুনামগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়ক ও ঢাকা-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়ক নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলআবারও ক্ষমতায় এসেছে দলটিকী অবস্থা সেই প্রতিশ্রুত মহাসড়কগুলোর?

সিলেট-সুনামগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়ক:

সিলেট-সুনামগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়ককে জাতীয় মহাসড়কে উন্নীত করতে গৃহীত প্রকল্পটি দীর্ঘ ৯ বছরেও আলোর মুখ দেখেনিএকাধিক সূত্রে জানা গেছে, ৭ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠনের পর ১৯৯৭ সালের মাঝামাঝি সময়ে তৎকালীন ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সুনামগঞ্জ সফরকালে স্থানীয় সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত জনসভায় বক্তব্য দেনসুনামগঞ্জ জেলাবাসীর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে জনসভায় বক্তৃতাকালে তিনি সিলেট-সুনামগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়ক প্রশস্ত করে জাতীয় মহাসড়কে উন্নীত করার ঘোষণা দেন

শেখ হাসিনার এ ঘোষণার আলোকে সড়ক ও জনপথ বিভাগ এ বিষয়ে প্রকল্প প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেপ্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার প্রায় ৩ বছর পর ২০০০ সালের মাঝামাঝি সড়ক ও জনপথ বিভাগ (সওজ) ১৮০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প তৈরি করে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়এরপর যোগাযোগ মন্ত্রণালয় অনুমোদনের জন্যে এ সংক্রান্ত ফাইলটি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে পাঠায়বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় এই প্রকল্পের অনুমোদন দেয়এরপর যথারীতি প্রকল্পটি একনেকের বৈঠকে উত্থাপনের জন্যে পাঠানো হয়

গৃহীত প্রকল্পে সিলেট-সুনামগঞ্জ মহাসড়কটির সকল ছোট আকৃতির ব্রিজ, ঝুঁকিপূর্ণ ব্রিজ ভেঙে নতুন ব্রিজ নির্মাণ ও সড়কটি ২৪ ফুট প্রশস্ত করার কথা ছিলএকই সাথে ৬৯ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এ সড়কটির প্রয়োজনীয় স্থান ভেঙে নতুন সড়ক হিসেবে গড়ে তোলারও উদ্যোগ নেয়া হয়েছিলপ্রকল্পটি বাস্তবায়নের মুহূর্তে আসে ৮ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন২০০১ সালের ৮ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ৪ দলীয় জোট সরকার গঠন করেসুনামগঞ্জ থেকে সরকার দলীয় ৩ জন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হনএকজন প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় জাতীয় সংসদের হুইপ, আরেকজন হন একটি মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী কমিটির সভাপতিসুনামগঞ্জবাসীর দীর্ঘ দিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে শেখ হাসিনার ঘোষণায় গৃহীত ১৮০ কোটি টাকার প্রকল্পটি ক্ষমতার পালাবদলের পরই থমকে যায়এক সময় আর এই প্রকল্পটির কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি৪ দলীয় জোট সরকারের শাসনামলে সিলেট-সুনামগঞ্জ মহাসড়কটির উন্নয়নে দফায় দফায় আন্দোলন হলেও কোনো ফল আসেনিসেই প্রকল্প হিমাগারে চলে গেলেও নতুন কোনো প্রকল্প গ্রহণ করা হয়নি

জানা গেছে, ব্রিটিশ শাসনামলে সিলেট-সুনামগঞ্জ মহাসড়কটির নির্মাণ কাজ শুরু হলেও পঞ্চাশের দশকে যান চলাচল শুরু হয়১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের পরই সড়কটি পাকা করা হয়২০০৪ সালের ভয়াবহ বন্যায় সড়কটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়বন্যার পর নামকাওয়াস্তে সড়কটির সংস্কার করেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ

৩৪টি হাওর অধ্যুষিত সুনামগঞ্জ জেলায় প্রায় ২৫ লাখ মানুষ বসবাস করছেনএ জেলা থেকে সরকার প্রতি বছর রাজস্ব পাচ্ছে প্রায় ১২শ কোটি টাকাএই জেলা থেকেই বিপুল পরিমাণ ধান, চাল, মাছ, বালু, কয়লা দেশের বিভিন্ন স্থানে নেয়া হয়জেলার ২৫ লাখ মানুষের পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী হবিগঞ্জ ও নেত্রকোনা জেলার বিপুলসংখ্যক লোকজন গুরুত্বপূর্ণ এই আঞ্চলিক মহাসড়ককে জাতীয় মহাসড়কে উন্নীত করা প্রয়োজন বলে মনে করছেনজাতীয় সড়কে উন্নীত হলে জীবনমানের পরিবর্তনের পাশাপাশি এ ৩ জেলার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও অনেকটা গতি আসবে

৯ বছর আগে গৃহীত প্রকল্প সম্পর্কে যোগাযোগ করা হলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে সড়ক ও জনপথ (সওজ) সুনামগঞ্জের জনৈক কর্মকর্তা বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে আমার কিছুই জানা নেইএই প্রথম শুনলামএর বেশি কিছু বলতে তিনি রাজি হননিএর সাথে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রও এই প্রকল্পের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে ধারণা দিতে পারছে নাতবে সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলের শেষ পর্যায়ে এসে সড়কটির উন্নয়নে ১৮০ কোটি টাকার প্রকল্প নেয়া হয়েছিল

এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে সুনামগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সুনামগঞ্জ সদর আসনের সংসদ সদস্য মতিউর রহমান বলেন, সিলেট-সুনামগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়ককে জাতীয় মহাসড়কে উন্নীত করার দাবি জানিয়ে সংসদে বক্তব্য দিয়েছিযোগাযোগমন্ত্রী আশ্বাসও দিয়েছেনসড়কটির উন্নয়ন ও পুরনো ব্রিজগুলো ভেঙে নতুন ব্রিজ নির্মাণের জন্যে তিনি সংশ্লিষ্টদের সাথে যোগাযোগ রাখছেন বলে জানান

ঢাকা-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়ক লালফিতায় বন্দি:

মৌলভীবাজারের উপর দিয়ে প্রস্তাবিত সিলেট-ফেঞ্চুগঞ্জ-মৌলভীবাজার-শ্রীমঙ্গল-চুনারুঘাট-নরসিংদী (এনএসএস) উন্নত আঞ্চলিক মহাসড়ক নির্মাণ প্রকল্প লালফিতায় বন্দি হয়ে আছেএদিকে হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলা বাদ দিয়ে মাধবপুর-শায়েস্তাগঞ্জ-শেরপুর বাইপাস সড়ক নির্মাণ করায় সীমাহীন দুর্ভোগে পড়েছেন দুই জেলার প্রায় ৩৫ লাখ লোক। স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার জন্য বহুল প্রত্যাশিত এই মহাসড়ক নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিলেও গত ৩৬ বছরেও তা আলোর মুখ দেখেনি

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর এ সড়কের নকশা পরিবর্তন করে হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলা ও মৌলভীবাজার জেলা সদর এবং শ্রীমঙ্গল উপজেলা বাদ দেয়া হয়মাধবপুর-বাহুবল-নবীগঞ্জ-শেরপুর হয়ে নতুন মহাসড়ক ২০০৫ সালের প্রথম দিকে যানবাহন ও জনসাধারণের চলাচলের জন্য খুলে দেয়া হয়এরপর থেকে চুনারুঘাট-শ্রীমঙ্গল-মৌলভীবাজার জেলা শহরের উপর দিয়ে সিলেট-ঢাকা যানবাহন চলাচল করছে নামাধবপুর থেকে শাহজীবাজার ও শায়েস্তাগঞ্জ-বাহুবল-নবীগঞ্জ-শেরপুর হয়ে ঢাকা-সিলেট, কুমিল্ল­া-সিলেট, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-সিলেটসহ বিভিন্ন রুটের যানবাহন যাতায়াত করেএতে মৌলভীবাজার সদর, শ্রীমঙ্গল, কমলগঞ্জ, শমসেরনগর, রাজনগর, ব্রাহ্মণবাজার, কুলাউড়া, বড়লেখা, জুড়ী ও হবিগঞ্জের চুনারুঘাটে ব্যবসা-বাণিজ্য মারাত্মকভাবে মার খেতে শুরু করে

তাছাড়া সারা দেশের সঙ্গে ফেঞ্চুগঞ্জ-রাজনগর-মৌলভীবাজার-কমলগঞ্জ-কুলাউড়া-বড়লেখা-জুড়ী-বিয়ানীবাজার-শ্রীমঙ্গল ও চুনারুঘাট উপজেলার সড়ক যোগাযোগ বিপর্যস্ত হয়ে পড়েঢাকা-চট্টগ্রামসহ দেশের অন্যান্য জেলায় যাতায়াত করতে এ অঞ্চলের মানুষকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে

২০০৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে এই সড়ককে আঞ্চলিক মহাসড়ক নাম দিয়ে বাহুবলের মীরপুর বাজার থেকে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের দুপাশে মাটি ভরাট ও পাহাড় কেটে দুপাশ সমতল করে বর্ধিতকরণ শুরু হলেও সংস্কার কাজে দীর্ঘসূত্রতা দেখা দিয়েছেঅপরদিকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ না নেয়া এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সিলেট-ফেঞ্চুগঞ্জ-নরসিংদী (এনএসএস) মহাসড়ক নির্মাণ প্রকল্প আবারও ফাইলবন্দি হয়ে পড়েছে

(শীর্ষ নিউজ ডটকম/ এএস/ এনএম/ ০০:০৫ঘ.)

 

সত্ত্বাধিকারঃ 2010 Sheershanews. সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত।
.